শিল্পায়ন বনাম জীবিকা : দুটি বাংলা উপন্যাসের প্রেক্ষিতে

শিল্পায়ন বনাম জীবিকা

সারসংক্ষেপ

সমাজের উন্নয়নের জন্য কৃষিভিত্তিক বিকাশের পাশাপাশি শিল্পায়নের বিশেষ দরকার রয়েছে। তবে শিল্পায়নের জন্য সরকারি বা বেসরকারিভাবে জমি অধিগ্রহণের প্রসঙ্গ চলে আসে। এক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট ভুক্তভোগী শ্রেণির ভালোমন্দের দায় এড়িয়ে যেতে চান বেশিরভাগ সময়। জমি অধিগ্রহণের পর পুনর্বাসনের প্রশ্নে দেখা বিরাট জটিলতা। সৃষ্টি হয় নানা সমস্যা সংকট। প্রসঙ্গত জীবিকা সংকট হয়ে দাঁড়ায় মূল বিবেচ্য বিষয়। ক্ষতিপূরণ থাকলেও জীবনযাপনের মানোন্নয়ন আশানুরূপ হয় না। ফলে সামাজিক উন্নয়নের প্রকৃত রূপরেখা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। উন্নয়ন শুধু পুঁজিপতি শ্রেণি দিয়ে বিচার্য নয়। সমাজের পিছিয়ে পড়া, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষদের সামাজিক-আর্থিক উন্নয়নে সামিল করা না গেলে, তা প্রকৃত উন্নয়ন হতে পারে না। কৃষি ও শিল্পের এই দ্বৈরথ দুটি উপন্যাসের প্রেক্ষাপটে আলোচিত হয়েছে। 

সৈকত রক্ষিতের ‘আকরিক’ এবং ঝড়েশ্বর চট্টোপাধ্যায়ের ‘বন্দর’ – উপন্যাসদুটি গত শতকের শেষ দুই দশকে রচিত। উভয় উপন্যাসেই জমি অধিগ্রহণ এবং তার ফলে উদ্ভূত সমস্যার নানা দিক উঠে এসেছে। সমকালের প্রেক্ষিতে এই আখ্যানদ্বয় হয়ে উঠেছে এক-একটি দলিল – জীবন-জীবিকার ‘ডকুমেন্টেশন’।

সূচক শব্দ : শিল্পায়ন, জমি অধিগ্রহণ, বাংলা উপন্যাস, জীবন-জীবিকা, সমস্যা-সংকট

শিল্পায়ন বনাম জীবিকা : দুটি বাংলা উপন্যাসের প্রেক্ষিতে  



মূল প্রবন্ধ

বিংশ শতকের সাতের দশক থেকে ভারত তথা পশ্চিমবাংলায় রাজনৈতিক পালাবদলের সূচনায় বাংলা সাহিত্য যে অনেকখানি প্রভাবিত হয়েছিল, তা অস্বীকার করবার নয়। কথাসাহিত্যকে যদি সমাজের দর্পণরূপে গণ্য করা হয়, তবে বলতে হয় সমকালীন পরিস্থিতির দোলাচলতা বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রকেও দোলায়িত করেছিল। জাতীয়-রাজনীতির বিপরীতে রাজ্য-রাজনীতির উত্থান, বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের বাস্তবায়নে অপরিকল্পতিত তৎপরতা, বিভিন্ন প্রকল্পসহ অন্যান্য বহু বিষয় যেমনভাবে তৎকালীন গ্রামীণ আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন সূচিত করছিল, তেমনিভাবেই যেন বাংলা সাহিত্যের অঙ্গনে একদল নবীন সাহিত্যিকের কলমে গ্রাম্য-সমাজ নতুনরূপে পাঠকের দরবারে এসে উপস্থিত হলো; যে আখ্যানের বিষয়বস্তু, দৃষ্টিভঙ্গি, ভাষা সবকিছুই যেন সচেতন কলমে বিচিত্রিত। সমকালীন সাহিত্যিকদেরই একজন লিখেছেন—

‘যে যাই বলুক, একথা বোধ করি অস্বীকার করবার উপায় নেই যে, বাংলা কথাসাহিত্যের ইতিহাসে সত্তর দশকটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেন? গুটিকয় উজ্জ্বল ব্যতিক্রম ছাড়া তখন কথাসাহিত্যের আঙ্গিনায় একটা বন্ধ্যা স্থিতাবস্থা এসে গিয়েছিল। একদিকে, কোলকাতা ভিত্তিক নাগরিক প্রেম-উপাখ্যানের ছড়াছড়ি।…অন্যদিকে, বামপন্থী কিছু লেখক উপন্যাস ও ছোটগল্পের শরীরকে পুরোপুরি রাজনৈতিক কাঠামোয় গড়তে চেয়েছেন। …এমন এক বন্ধ্যা পরিস্থিতিতে, সত্তর দশকে এলেন একঝাঁক তরুণ কথাশিল্পী, যাঁরা বাংলা কথাসাহিত্যে  নতুন করে গতিসঞ্চার করলেন।’1

সদর্থেই এই পর্বের আখ্যানকাররা প্রত্যেকেই নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি, পৃথক ‘ভৌগোলিক স্পেশালাইজেশন’ বজায় রেখেও ‘কথাসাহিত্যের আঙ্গিনায় সামগ্রিকভাবে একটি সমষ্টিগত identity’2 তৈরি করেতে পেরেছেন। এককথায় ‘সাব-অল্‌টার্ন’ সাহিত্যচর্চার সচেতন প্রয়াস লক্ষ করা গেল এঁদের রচনায়। এইসব আখ্যানকারদের মধ্যে অন্যতম হলেন—সাধন চট্টোপাধ্যায়, ভগীরথ মিশ্র, ঝড়েশ্বর চট্টোপাধ্যায়, অভিজিৎ সেন, অনিল ঘড়াই, সৈকত রক্ষিত প্রমুখ।

         স্বাধীনতা-উত্তর পর্বে পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট জমানায় কয়েকটি বিষয় সবিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণের দাবি রাখে, তা হলো– বিপুল ভূমিসংস্কার, অপারেশন বর্গা ও ভূমিহীনদের পাট্টা নথিভুক্তি। এক্ষেত্রে শিল্পায়নে বিশেষত বিংশ শতকের নয়ের দশক পর্যন্ত তেমন কোনো ইতিবাচক পরিস্থিতি লক্ষ করা যায় না। প্রসঙ্গত উলেখ্য,

‘বিংশ শতাব্দীর আশির দশকে (পশ্চিমবঙ্গে না হলেও) সারাদেশে অত্যন্ত দ্রুত শিল্পায়ন ঘটেছে। আবার, ওই দশকেই (পশ্চিমবঙ্গসহ) সারাদেশে ব্যাপকভাবে বেড়েছে শিল্পের রুগ্নতাও।’3

অর্থাৎ কৃষির প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রে সাময়িকভাবে সাড়া ফেললেও শিল্পায়নে তেমন জোয়ার আসেনি। একইভাবে শিল্পায়ন এবং ভূমি যেমন একে অপরের পরিপূরক তেমনি সঠিক জমির অভাবে শিল্পের অগ্রগতি যে রুদ্ধ হবে তা স্বাভাবিক। আবার এও দেখা গেছে যে, শিল্পায়নের কারণে অপরিকল্পিতভাবে জমি অধিগ্রহণ নানাভাবে প্রতিবাদের জন্ম দিয়েছে। এর পিছনের কারণ অনুসন্ধানে যতগুলি বিষয় সামনে আসে তারমধ্যে অন্যতম বোধহয় জীবিকার সমস্যা। তবে এই সমস্যা কখনো সাময়িক কখনো বা দীর্ঘায়িত। যাইহোক শিল্পায়ন এবং জীবিকা—এই উভয়কে বিষয় করে বাংলা সাহিত্যে যেসব গল্প-উপন্যাস লেখা হয়েছে, আলোচ্য প্রবন্ধে তার মধ্যে থেকে দুটি উপন্যাস নির্বাচিত করে আলোচনায় অগ্রসর হওয়া যায়। গত শতকের শেষ দুই দশকে প্রকাশিত উপন্যাসদুটির কেন্দ্রীয় বিষয় এক হলেও স্থানিক সাদৃশ্য নেই বললেই চলে—একটি সৈকত রক্ষিতের ‘আকরিক’ (১৯৮৪) এবং অন্যটি ঝড়েশ্বর চট্টোপাধ্যায়ের ‘বন্দর’ (১৯৯২)।

প্রত্যন্ত পুরুলিয়ার সমস্যা ও সংকটবহুল জনজীবনের কাহিনি শুনিয়েছেন কথা সাহিত্যিক সৈকত রক্ষিত (১৯৫৪ খ্রি.–) । তিনি পুরুলিয়ার ভূমিপুত্র। আধুনিকতার স্পর্শ-বঞ্চিত পুরুলিয়ার প্রত্যন্ত গ্রামগুলিতে ভবঘুরের মত ঘুরতে ঘুরতে তাঁর লেখক হবার স্বপ্ন অঙ্কুরিত হয়। বাংলা সাহিত্যে অদ্যাবধি সৈকত রক্ষিত গ্রামবাংলার নিম্নজীবী মানুষের কথা লিখেছেন, লিখছেন, যা তাঁকে ‘প্লাসওয়ান’4–এ পরিণত করেছে, আলাদাভাবে চিনিয়েছে। সাতের দশক থেকে বাংলা সাহিত্যে যে বাঁকের সূচনা, যার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল নিম্নবর্গ বয়ানের অনিবার্যতা; কথাকার সেই পথেই অগ্রসর হয়েছেন। লেখক তাঁর লেখা প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছেন,

‘আমার লক্ষ্যই হলো সাব-অল্টার্নদের নিয়ে লেখালেখি। এই সীমিত জনগোষ্ঠী ভাষা, সংস্কৃতি, জীবনযাপনের ধারা এবং বাঁচার দুর্মর প্রয়াসকে বাংলা সাহিত্যে নিয়ে আসা।’5

–স্পষ্টতই লেখক তাঁর লেখার উদ্দেশ্যমূলকতার জানান দিয়ে দেন। তিনি প্রকৃতপক্ষে রচনা করেন ‘ডকুমেন্টেশন’—স্বচক্ষে দেখা জনজীবনের সমস্যা-সংকটের নিদারুণ ছবি।

         পুরুলিয়ার জনজীবনের কথা লিখতে গিয়ে লেখককে সেখানকার মানুষের জীবন-জীবিকার সংকটের কথা বলতে হয়েছে। সাতের-আটের দশকের জমি-অর্থনীতি, পঞ্চায়েত ব্যবস্থায় দুর্নীতির কালোছায়া, সরকারি প্রকল্পের বাস্তবায়নে পরিকল্পনার অভাব –সমস্তকিছুই গ্রামীণ মানুষগুলিকে কঠিন লড়াইয়ে সামিল করেছিল। লেখকের রচিত প্রথম উপন্যাস ‘আকরিক’ (১৯৮৪ খ্রি.) তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

‘আমার লেখালেখির জীবনের শুরুতেই লক্ষ্য ছিল এখানকার [পুরুলিয়া] ভাষা-সংস্কৃতিকে বাংলা সাহিত্যে অন্তর্ভুক্ত করা। ‘আকরিক’ থেকেই সেই প্রয়াসের শুরু। সেই সঙ্গে আমার ভাবনা এটাও ছিল যে, আমার পটভূমি, বিষয়বস্তু, উপাদান এবং চরিত্ররা এমন হবে যা ইতিপূর্বে লেখা হয়নি।’6

–অর্থাৎ লেখকের প্রথম উপন্যাস থেকেই তিনি নতুন পথের পথিক, ‘প্লাসওয়ানে’র যাত্রী। পুরুলিয়া হলো বাংলার প্রত্যন্ত একটি জেলা। এই জেলার প্রত্যন্ত কয়েকটি পঞ্চায়েতের সংকটপূর্ণ জীবনের কথা রয়েছে ‘আকরিক’ উপন্যাসে। শিল্পায়নের প্রসারে জীবন ও জীবিকা কিভাবে সমস্যা জর্জরিত হতে পারে তার চিত্র উপন্যাসটিতে পরিস্ফুটিত। একসময় ব্রজপুর-হেঁসাহাতু-কলমা অঞ্চলের (পশ্চিম পুরুলিয়ার প্রত্যন্ত মৌজা) মাঝি-মুড়া-দিগার-লাপিত-সাউ-মাহাত প্রভৃতি মেহনতি মানুষের সামনে কাজ নিয়ে উপস্থিত হয় ঠিকাদার। কারণ হেঁসাহাতু অঞ্চলে চুনাপাথরের খাদান পাওয়া গেছে এবং ঠিকাদারবাবু সেই খাদান থেকে  চুনাপাথর শহরে নিয়ে যাবেন।

         ‘কাতর মানুষগুলো একদিন অবাক হয়ে গেল ! তাদের ক্ষুধার রাজ্যে এসে ঢুকলো শহরের মোটর গাড়ি। ট্যারাক।’7

-–‘আকরিক’ উপন্যাসের মূল কাহিনি শুরু হয়েছে এখান থেকেই। মোটর গাড়ি তো এমনি আসেনি, এসেছে ‘লিত্‌ ভখাদের’ কাছে ‘কাম’ নিয়ে। মাঝি-মুড়া-দিগার-লাপিত-সাউ-মাহাতরা দীর্ঘদিনের অলস-বেকার জীবনের মাঝে কাজের সন্ধান পেয়ে যায়, সাময়িকভাবে আশ্বস্ত হয় এইভেবে যে তাদের আর অনাহারে জীবন কাটাতে হবে না। হেঁসাহাতু-কলমা প্রভৃতি অঞ্চল জুড়ে নানারকমের আকরিকের খাদান রয়েছে। আকরিক সমৃদ্ধ অঞ্চলে সরকারি প্রকল্প বাস্তাবায়িত হওয়ার আগেই বেসরকারি কোম্পানি এই আকরিক উত্তোলনে অগ্রসর হয়। ঠিকাদারবাবুর আগ্রহে এই অঞ্চলের মানুষেরা পাথর কাটার কাজ পায়। মজুরি সামান্য কিন্তু ‘কামিয়া লক ইয়াতেই খুশ।’

সৈকত রক্ষিতের 'আকরিক'
সাহিত্যিক সৈকত রক্ষিত

         পাথরের খাদানে কামিয়া লোকেদের পাশাপাশি পূর্বদিকের কলমা অঞ্চলের কৃষিজীবী মানুষের কথাও উঠে এসেছে। যখন সরকার কলমা-মাহাতমারা অঞ্চলে বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নেয় তখন এখানকার জমির উপর নির্ভরশীল মানুষের জীবনেও আতঙ্কের ছায়া পড়ে। বাঁধ প্রকল্পের বাস্তবায়নে বহু জমি অধিগ্রহণ জরুরি, অথচ এই জমিতে শত মানুষের জীবনযাপন জড়িত।

See also  বাংলা উপন্যাস সাহিত্যে প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় : কয়েকটি প্রসঙ্গ

         আকরিকের খাদানের কাজ সেখানকার জনজীবনকে সচল রেখেছে। সামান্য কিছু মজুরির জন্যে তাদের কি অমানুষিক পরিশ্রম করতে হয়, ‘কাম করতে হবেকই। কাম না করলে পেটের আগুন জুড়াবেক কিসে? তার উপর আদ্যাভখা না হলে কেউ এই যমের খাদানে কাজ করতে আসে !’8 প্রতিনিয়ত এদের জীবন ঝুঁকিপূর্ণ অথচ সরকার সম্পূর্ণ উদাসীন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, উপন্যাসে দুটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রকল্পের প্রসঙ্গ এসেছে, কিন্তু বলাই বাহুল্য উভয়ই অভিশাপ হিসেবে বর্ষিত হয়েছে এই অঞ্চলের মানুষের জীবনে। প্রথমে কলমা অঞ্চলে ড্যাম তৈরির উদ্যোগ নেয় সরকার আর দ্বিতীয় ক্ষেত্রে সমগ্র হেঁসাহাতু-কলমা অঞ্চলের আকরিকের উপর নির্ভর করে সিমেন্ট ফ্যাক্টরি। লক্ষ করলে দেখা যাবে উভয়ক্ষেত্রেই ক্ষতিগ্রস্ত হবে চাষের জমি এমনকি বাসভূমিও। শিল্পায়নে জমি অধিগ্রহণ আইনসঙ্গত কিন্তু অপরিকল্পিত জমি অধিগ্রহণে জমির স্বত্বাধিকারীদের জীবন কতখানি বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়ে তার পরিচয় পাওয়া যাবে এই উপন্যাস পাঠে।

ব্রজপুর-হেঁসাহাতু-কলমা অঞ্চলের জনজীবনে যেভাবে জীবন-জীবিকার সংকট দেখা দিয়েছে তার কয়েকটি স্তর চিহ্নিত করা যায়-

[ক] চুনাপাথরের খাদানে কাজ পাওয়ার মধ্যে দিয়ে চাষি থেকে সস্তার মজুরে পরিণত হওয়া ;

[খ] জমিতে ‘গাড়হা’ করার চুক্তিতে ঠিকাদারের প্রতারণায় জমির স্বত্ত্ব হারানো ;

[গ] বাঁধ তৈরির জন্য জমি অধিগ্রহণ, চাষের জমি হারানো ;

[ঘ] সিমেন্ট ফ্যাক্টরি তৈরির জন্য জমি অধিগ্রহণ, সর্বোপরি পাথরের খাদানের কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়া।

লক্ষণীয় সর্বক্ষেত্রেই পঞ্চায়েত তথা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছ থেকে এই অঞ্চলের মানুষকে বঞ্চনার শিকার হতে হয়েছে। উপন্যাসের সীমিত পরিসরে টুকরো টুকরো বয়ানের মধ্যে দিয়ে কথাকার বিভিন্ন জীবিকার কথা তুলে ধরেছেন। রুক্ষ অনুর্বর মালভূমি অধ্যুষিত অঞ্চলে কিভাবে জনজীবন সচল থাকে তার আভাস পাওয়া যায়। যাদের চাষের জমি আছে তারা চাষ-আবাদ করে, না থাকলে পাথরের খাদানে পাথর ভাঙার কাজ। ঘানা-ছেনি নিয়ে দুইজনের দল পাথর ভাঙ্গে। এক ‘খড়মা’ পাথর ভাঙলে চার টাকা; ২৫ ঘনফুট (Cft.) অর্থাৎ প্রায় এক টন ওজনের চুনাপাথরের ব্লক হলো এক ‘খড়মা’। সারাদিনের চরম খাটুনিতে এরা প্রত্যেকে তিন টাকার বেশি আয় করতে পারে না। কিন্তু এই সামান্য কটা টাকা এইসব মেহনতি মানুষের  কাছে সামান্য নয়, ‘হঁ, এক টাকা ত এক টাকাই। শালা, সের দু’সের চাল ত হবেক। নকি বল ?’ শীতের মরশুমে কলমা অঞ্চলের চাষিরা কঠোর শ্রমে গমের আবাদ করে, কিন্তু হেঁসাহাতুর লোক তখন কুসুম কাঠ কুঁদে হাল বানায়, দুদিনের মেহনতে দুটো হালের বিনিময়ে পাঁচ টাকা রোজগার করে। সাঁওতাল কুলহি’র বউ-ছেলেমেয়েরা বসে থাকে না, পাহাড়ি বন থেকে কেন্দু পাতা (বিড়ি তৈরির পাতা) কুড়িয়ে আনে, পনেরো পয়সা শ’-এর হিসেবে পাতামালিকদের কাছে বিক্রি করে।

         চুনাপাথরের টিলায় পাথর ভাঙার কাজে পেট চলে ঠিকই কিন্তু সে কাজ কঠোর পরিশ্রমের। খাদানের কাজ বন্ধ হলে আবার উপবাসে থাকা। রুক্ষ জমিতে জলের অভাবে ফসল ফলানো যায় না, সেই সমস্যার সরকার বাঁধ তৈরির প্রকল্প গ্রহণ করলো। জমি অধিগ্রহণে জমির দখলদারিদের ‘লীট দাবি’ জানাতে বলা হলো। কিন্তু বাস্তবিক সরকারি উদাসীনতা ও সঠিক পরিদর্শনের অভাবে সাধারণ মানুষদের যে কতখানি ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয় তার দৃষ্টান্ত রয়েছে এই উপন্যাসে,

‘…যদি গরমেন্টি ক্ষেত-ডুবাদের একটা মটাসটা কিছু ব্যবস্থা করত—অন্য জায়গায় জমিদারের বেনামী জমি খাস করে বোদোল দিত, তাহলে বলা চলত…কিন্তুক গরমেন্টি ক্ষেত-ডুবাদের নিয়ে রা কাড়ছে নাই। খালি বলছে ‘লীট দাবি’ জানাও।’9

‘শুধু কলমা অঞ্চল জল পাবেক আর হেঁসাহাতু পাবেক নাই ক্যানে ?’10

‘তুমি গরমেন্টি। পাব্লিকের কাম করার তুমি এক্তিয়ার। তা বলে, পাব্লিক বাঁচল কি মরল—ই খোবোর লিবে নাই ?’11

‘…তুমি মানুষ খেদে গাঁয়ে গাড়্‌হা করবে—ই মানুষগুলা যাবেক কথায় ? তুমি পহিলে ইয়াদের ব্যবস্থা কর। তা বাদে গাড়্‌হা। তা-ও যদি করতে হয় সুবন্ন র‍্যাখায় [সুবর্ণরেখা] বাঁধ দাও। গরমেন্টি আমাদে স্যা প্রস্তাব লাকচ্‌ করে দিয়েছে।’12

খনিজ সমৃদ্ধ পাহাড়ি এলাকায় প্রাইভেট কোম্পানির ঠিকাদার জমি থেকে ‘চায়না ক্লে’ সগ্রহে জমির মালিকদের টোপ হিসেবে দেয় নামমাত্র মজুরির কাজ আর জমিতে ‘গাড়্‌হা’ জরিমানা দিয়ে জমিগুলো কোম্পানির নামে লিখে নেওয়া। যদিও সরকারি হস্তক্ষেপে কোম্পানি জমি ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় কিন্তু এদিকে ‘জমিও ফাচোট্‌, কামও ফাচোট্‌।’ তখন শিবু গোঁসাই হাটে গেয়ে বেড়ায়—

‘আমার ক্ষ্যাত গেল ডব্‌হা হল

গরু-হালে কী হবেক?

যমের গাড়্‌হায় সনা তুপা

ডব্‌হা লিয়ে কী হবেক ?’13

কলমা অঞ্চলে জলের অভাব মেটাতে একসময় সরকার ড্যাম তৈরির কথা ঘোষণা করে। মাইলের বেশি জমি নিয়ে তৈরি হবে কাঁড়িয়র ড্যাম, ডিমু ড্যাম। বাঁধ তৈরি হলে কলমা অঞ্চলে জলের অভাব মিটবে সন্দেহ নেই কিন্তু এক্ষেত্রে সরকারি নীতির (১৮৯৪ সালে গৃহীত জমি অধিগ্রহণ নীতি যা ২০১৩ সালে সংশোধিত হয়েছে) গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। ঝালদা অঞ্চলে সিমেন্ট ফ্যাক্টরি হবে, ‘বাবুদের বিলডিন হবেক টৌনে। আর হেঁসাহাতু-কলমায় ? খেদ [তাড়াও] সব লিত ভখাদের । ঠিকাদার ত বলে গেছে, ভখে মরবি।’—কী চরম সত্য ! এক লপ্তে অর্ধভুক্ত কর্মঠ মানুষদের দীর্ঘশ্বাস যেন পাঠক শুনতে পান।  

স্বল্প পরিসরের উপন্যাসটিতে প্রান্তিক বর্গের জীবন-জীবিকার কথাই শুধু নয়, স্পষ্ট প্রতিবাদের সুর ধ্বনিত হয়েছে। পাঠক নিশ্চয়ই লক্ষ করবেন, উপন্যাসের কাহিনি যত অগ্রসর হয়েছে প্রতিবাদের সুর তত ঘনীভূত হয়েছে। উপন্যাসের সমাপ্তিও প্রতিবাদের মধ্যে দিয়ে—

‘পরের দিন সাত হাজার কামিয়া। বুড়্‌হা-বুড়ি ছেলা-মেঞা। হাতে ঝাণ্ডা। ফতাঙ্গা। গাঁইট-কদাল-টাঙী-বল্লম-কাঁড়ধনুক! বর্‌জপুর থেকে মাহাতমারা হয়ে চৈল্য। ইনক্লাপ জিন্দাবাদ!’14

১৯৭৩ সালের ‘পঞ্চায়েত আইন’ অনুসারে পশ্চিমবঙ্গে ১৯৭৮ সালে পঞ্চায়েত নির্বাচন হয়। পশ্চিমবঙ্গে এই নির্বাচনে নিরঙ্কুশ ভাবে জয়ী হয় সরকার পক্ষ অর্থাৎ সিপিআই(এম) দল। এর আগের বছর (১৯৭৭ খ্রি.) বিধানসভা ভোটে জয়ী হয়ে আসে বামফ্রন্ট দল। এইসময় পশ্চিমবঙ্গ সরকার একগুচ্ছ প্রকল্প গ্রহণ করে, সেগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল ‘বর্গাদার আইন’ (১৯৫০ খ্রি.) বাস্তবায়নের জন্যে ‘অপারেশন বর্গা’ কর্মসূচি গ্রহণ করা। এর লক্ষ্য ছিল ভাগচাষি ও ভূমিহীন ক্ষেতমজুরদের জমির স্বত্ব দেওয়া। কিন্তু আইন নিশ্ছিদ্র ছিল না ফলে যা হবার তাই হল। অনেকক্ষেত্রেই বঞ্চিতরা ভাগচাষের অধিকার হারালো, ভূমি থেকে উচ্ছেদ হতে লাগলো। উপন্যাসে দেখি, রামভজন সাউ-এর জমির ভাগচাষি আদিম আনসারীকে তার স্বত্ত্ব থেকে বঞ্চিত করার সর্বত প্রচেষ্টা রামভজন করতে বাকি রাখেনি। বিভিন্ন উপায়ে এই অনিয়ম চলতে লাগলো—বন্ধকী জমি কোবালার সুযোগে নিজ নামে লিখিয়ে নেওয়া,  হাল রসিত না থাকলে দখলি জমিও জমিদারের খতিয়ানে যুক্ত হওয়া, জমি বেদখল করে প্রথমে বেনামি পরে জমি আত্মসাৎ, সেটেলমেন্টে প্রজার জমি কম করে দেখানো ইত্যাদি।

See also  কথাকার সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ, লেখক জীবনের প্রেক্ষিত

         স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে নতুন পঞ্চায়েত ব্যবস্থায় গ্রামগুলির শ্রীবৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল। সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পে গ্রামগুলিতে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। গ্রামের স্বল্প আয়ের মানুষ বিভিন্ন প্রকল্পের সুযোগ পাচ্ছিল। কিন্তু সংখ্যাতত্ত্বের বিচারে তা নগণ্য বললেই চলে। পঞ্চায়েতে দুর্নীতি খুব শীঘ্রই মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল। বিভিন্ন প্রকল্প অসমাপ্ত থাকলেও কাগজে-কলমে সমাপ্ত দেখান হল, ‘…পুন্‌না বাঁধ লতুন করে কুঁড়ার রিলিপের কাম ছিল। ৮০ কুন্টালের আলটম্যান। স্যা কাম চৈখেও দেখা গেল নাই। পঞ্চায়েতের খাতা-কলমেই বাঁধ কুঁড়া হয়ে গেল।’15 পঞ্চায়েত সদস্যরাও ক্রমশ দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়লো। এর থেকে নিস্তারের উপায়ও লেখক উপন্যাসে দেখালেন, প্রতিবাদের মাধ্যমে নিজেদের দাবি জানাতে হবে। কিঙ্কর দত্ত হলো সেই প্রতিবাদের মুখ। সমগ্র উপন্যাসে এই ‘একজন’ কামিয়া-ভাগচাষিদের হয়ে কাজ করেছে। পঞ্চায়েতের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী চিঠি লিখে, পিটিশন দিয়ে বঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে, ‘..সোব কামে ‘য়ুনিয়ন’ কর। কিষাণরা কর চাষ কাজের য়ুনিয়ন, কামিয়া লকরা কর খাদানের য়ুনিয়ন। না হলে গাঁয়ে টেকতে লারবে।’16  সমগ্র উপন্যাসটিতে আলোচিত এই দুটি ভাব কেন্দ্রীভূত হয়েছে, একদিকে প্রান্তবর্গের মানুষের জীবন-জীবিকার সমস্যা অন্যদিকে তাদের মধ্যে প্রতিবাদী সত্ত্বার জাগরণ। এই কারণে এই উপন্যাস শুধু সমস্যা-সংকটের কথা জানায় না, সেই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের কথাও বলে। তাই শেষপর্যন্ত এই উপন্যাস প্রতিবাদের গল্প হয়ে ওঠে।

সত্তর দশকের কথাকার ঝড়েশ্বর চট্টোপাধ্যায়ের (জন্ম—১৯৪৮) আখ্যানের পটভূমির প্রতি দৃষ্টি দিলে লক্ষ করা যাবে, দক্ষিণবঙ্গ প্রধানত দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার খাল-বিল-নদীনালা-সমুদ্র’র সঙ্গে লেখকের আখ্যানের নিবিড় যোগ। সাহিত্যিক ভগীরথ মিশ্রের ভাষায়—

‘আমার বন্ধুদের মধ্যে যাঁরা দক্ষিণ ২৪ পরগণার সুন্দরবন অঞ্চলের জীবনকে কথাসাহিত্যে উজ্জ্বল করে এঁকে চলেছেন।….দক্ষিণ ২৪ পরগণা এলাকার কৃষক আন্দোলন, তেভাগা ও মেহনতি মানুষের হাজারো লড়াইয়ের কথায় তাঁর কলম সদাই সোচ্চার।’17

মেহনতি মানুষের জীবন-জীবিকার সমস্যা নিয়ে লেখক ঝড়েশ্বর চট্টোপাধ্যায় লিখলেন তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘বন্দর’ (১৯৯২)। দক্ষিণবঙ্গের সমুদ্রের কাছাকাছি হুগলি নদী-সংলগ্ন একটি এলাকায় অবাধ বাণিজ্যের কেন্দ্র গড়ে তোলার সরকারি প্রকল্প গ্রহণের সঙ্গে-সঙ্গে সেই এলাকায় জমি-মানুষের সম্পর্ক, নদী-জমির সম্পর্ক কিভাবে দ্রুত বদলে যায় তার কাহিনি বিবৃত করেছেন লেখক তাঁর নিজস্ব কথন-ভঙ্গিতে। উপন্যাসের ভরকেন্দ্রে রয়েছে বৃহত্তর স্বার্থে সরকারি প্রকল্প রূপায়ণে জমি-অধিগ্রহণ এবং ফলশ্রুতিতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জীবন-জীবিকা সংক্রান্ত উদ্ভূত সমস্যার প্রতিফলন।  লেখক আলোচ্য আখ্যানে গভীর সমাজবাস্তবতার পরিচয় দিয়েছেন। লেখক স্বয়ং সরকারি আধিকারিক হওয়ায় উদ্ভূত সমস্যার গভীরে আলোকপাত করতে পেরেছেন, তুলে এনেছেন মানবিক প্রতিচ্ছবি। উপন্যাসের নিবিড়-পাঠে লক্ষ করা যাবে—নদী-তীরবর্তী একটি জনপদ কিভাবে দ্রুত বদলে যাচ্ছে, তাদের জীবনচর্যা কিভাবে প্রভাবিত হচ্ছে সমকালিক কিছু ঘটনার দ্বারা কিংবা জীবিকার তাগিদে একটা জনপদের মানুষজন পশ্চাদপৎ থেকে যাচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে ‘বন্দর’ উপন্যাসে একটি মুক্ত বাণিজ্যকেন্দ্র গড়ে ওঠার ফলে বঞ্চিত, বাস্তুচ্যুত একটি জনপদের কথা উঠে এসেছে।

কথাকার ঝড়েশ্বর চট্টোপাধ্যায়

পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট আমলে শিল্পায়নের জন্য বড়ো আকারের যে জমি অধিগ্রহণ শুরু হয়েছিল ১৯৮১ সালে দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা জেলার ফলতা অঞ্চলে। প্রথমে ১৯৬০ একর এবং পরে ৭০০ একর বাস্তু ও কৃষিজমি অধিগ্রহণ করে গড়ে তোলা হয়েছিল বহুল প্রচারিত ফলতা মুক্তবাণিজ্য উন্নয়নকেন্দ্র (Falta Free Trade Zone)। যদিও সরকারি ভাষ্যে এই জমি অধিগ্রহণের পরিমাণ অনেক কম ছিল।18 ফলতা ব্লকের অকালমেঘ, শিমূলবেড়িয়া, নৈনান প্রভৃতি মৌজা অধিগ্রহণ করে এই ‘ফ্রি ট্রেড জোন’ গড়ে তোলার প্রকল্প গৃহীত হয়েছিল। এবং পার্শ্ববর্তী গোপালপুর মৌজার ৮০ একর জমি অধিগ্রহণ করে গড়ে তোলা হয়েছিল ‘হাইল্যান্ড কলোনি’, গৃহহারা পরিবারগুলির একমাত্র আশ্রয়স্থল।

উপন্যাসে ‘কলতা’ (ফলতা) অঞ্চলের কাঁকালমেঘ (অকালমেঘ), শীতলবেড় (শিমূলবেড়িয়া), মৈনান (নৈনান), মিষড়া (বিশরা), সারাগঞ্জ (তারাগঞ্জ), নেপালপুর (গোপালপুর)—এই মৌজাগুলি কাহিনিবয়নে স্থান পেয়েছে এবং বাস্তবিক এখানকার বসবাসকারী মানুষগুলি মুক্তাঞ্চল নির্মাণে প্রত্যক্ষভাবে প্রভাবিত হয়েছিল।

ফলতা-সংলগ্ন অঞ্চলে নদীর চড়া পড়ে জাহাজ চলাচলে অসুবিধা সৃষ্টি হওয়ায় ‘কোলকাতা পোর্ট ট্রাস্ট’ অনেক আগেই কাঁকালমেঘ মৌজা অধিগ্রহণ করে সেখানে নদীর বালি ফেলেছিল; সকলের কাছে সেই মাঠ পরিচিতি পেয়েছিল সি.পি.টি.-র মাঠ হিসেবে। পাহাড়-সমান উঁচু সেই মাঠ ভাঙতে গিয়ে ছাগল ব্যাপারি বিনোদ কাঞ্জির ‘বুকের ভিতরটা মুচড়ে যায় ! গাছগুলো সুরথ কয়ালের বাস্তু-ভিটের সাক্ষী। সুরথেরা শিয়ালদা ইস্টেশনে শুয়ে ভিখ মেগে দিন কাটায়। তাদের গাছপালা গলা অব্দি মাটি ঢাকা পড়ে দম নিচ্ছে। আর মানুষগুলো যে কোথায় উঠে গেছে……।’19 সুরথের মতো এই মৌজার অন্যান্য মানুষগুলো বাস্তুচ্যুত হয়ে জীবিকার খোঁজে চলে যায় অন্য কোথাও। যদিও ঝুমরি, হরিপদরদের মতো পঁচিশ ঘর থেকে যায় অধিকৃত মৌজায়। কিন্তু যখন মুক্তাঞ্চল নির্মাণের লক্ষ্যে দ্বিতীয়বার শীতলবেড়সহ কয়েকটি মৌজা সরকার অধিগ্রহণ করে, তখন হরিপদরা দেশভাগের কারণে ছিন্নমূল হওয়া ‘কলোনির পার্টি’দের থেকে নিজেদের তফাৎ করতে পারে না। অর্থাৎ জমি অধিগ্রহণের কারণে বাস্তুহারা মানুষগুলি যেন মাতৃভূমি হারানোর যন্ত্রনায় কাতর হয়।

ফলতা বাণিজ্যকেন্দ্র নির্মাণের প্রসঙ্গে এসে পরে জীবিকা-চিত্র—শুধুই যে জীবিকার সংকট উপস্থাপিত হয়েছে তাই নয়, জীবিকার নতুন নতুন ক্ষেত্রও প্রস্তুত হয়েছে। শীতলবেড়ের জুব্বার কিংবা ঝুমরিদের মতো পশুচরানি বৃত্তিই যেখানে জীবনধারণের একমাত্র উপায়, সেখানে উন্মুক্ত চারণভূমির অভাব যে তাদের শঙ্কিত করবে তা বলাই বাহুল্য। একসময় সি.পি.টি.র মাঠে জুব্বারের কৃষিজমি ছিল, সেই মাঠে এখন সে ছাগল চরায়। আবার সেখানে কারখানা গড়ে উঠলে, তাদের জীবিকার ক্ষেত্র স্বাভাবিকভাবেই সংকুচিত হবে। এক্ষেত্রে জুব্বার কিংবা ঝুমরিদের ‘হাইল্যান্ড কলোনি’তে পুনর্বাসন হলেও ‘জীবিকার পুনর্বাসন’ অধরাই থেকে যায়। এবং এখানেই সরকারি প্রকল্পের সীমাবদ্ধতার প্রসঙ্গ এসে পরে। মৈনানের জেলেপাড়ায় সরকারি আই.আর.ডি.পি. প্রকল্পের মেশিন বোট দেওয়ার কথা এসেছে। কিন্তু গির্জার ফাদার ও বিডিও সাহেবের কথা প্রসঙ্গে উঠে আসে শহুরে সংস্কৃতির আগ্রাসন। অনেক জেলেই যে মাছ ধরতে নদীতে যেতে চায় না, তার কারণ “বোরডম। এক ঘেয়েমি। কতদিন আর নদীতে থাকতে ভালো লাগে। শহরের মজায় আটকে গেছে।”20 তবে শুধুই শহুরে সংস্কৃতির আগ্রাসন নয়, নদীতে মাছের পরিমাণ ক্রমশ কমে যাওয়া21 কিংবা মাছের যথাযথ মূল্য না পাওয়াও অন্যতম কারণ। লতিফ শেখ নৌকায় প্যাসেঞ্জার বহন করে। প্রযুক্তির উন্নয়নে এখন লঞ্চ সেই স্থান দখল করেছে। লতিফের ভাবনায়, “সারাদিনে কেউ ওপারের প্যাসেঞ্জার নেই। সব গিলে নিচ্ছে পাশের লঞ্চটা…। এখন লঞ্চের বেলায়? কোনো হিসেবপত্তর নেই। যত পারো মানুষ মালপত্তর ঠাসো।”22 এখানে জীবিকা সংকটের খণ্ড চিত্রের সমবায়ে পাঠকের বুঝতে অসবিধা হয় না জীবিকা সমস্যার প্রকৃত অবস্থাকে উপলব্ধি করতে।

পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে শুধু জীবিকার সংকটই উপস্থিত হয় নি, অনেক নতুন নতুন জীবিকা-ক্ষেত্রও প্রস্তুত হয়েছিল ‘কলতা’ অঞ্চলে জমি অধিগ্রহণ-কেন্দ্রিক পরিস্থিতিতে। মুক্ত-বাণিজ্যাঞ্চল নির্মাণে প্রাথমিকভাবে সেখানে প্রয়োজন পরে ল্যান্ড ডেভলপমেন্ট। এবং সেক্ষেত্রে রাস্তা নির্মাণসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে প্রচুর মজুরের চাহিদা বৃদ্ধি পাবে তা স্বাভাবিক। শীতলবেড়, কাঁকালমেঘ, গড় কলোনি প্রভৃতি জায়গার অনেকেই সেই মজুরের কাজে যুক্ত হয়েছিল; অনেকসময় তারা ঠিকাদারদের কাছে নিজেদের কাজের দাবি জানিয়ে সংঘবদ্ধও হয়েছিল। অন্যদিকে বিনোদ কাঞ্জির মতো স্বল্পশিক্ষিত, সামান্যকিছু পুঁজির মালিক, তারা ছোটোখাটো ঠিকেদারির কাজে নেমে পড়েছিল। একসময়ের ছাগল-ব্যাপারি ‘বিনোদ পাঁঠা’ হয়ে উঠলো বিনোদ ঠিকাদার।

See also  গোঠ-জীবনের বারোমাস্যা : 3টি বাংলা উপন্যাসের প্রেক্ষিতে

একইভাবে সেবা প্রতিষ্ঠানে চাকরি করা শীতলবেড়ের নুরুল এবং যাত্রাদলের হরিপদ তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী কাজে যুক্ত হয়েছে। তে-মাথানির মোড়ে নতুন চায়ের দোকান খুলেছে পয়মাল। এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোনের কারণে এই অঞ্চলে মানুষের সমাগম ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে, ফলে পয়মালের দোকানে বিক্রি বেড়েছে। যেসব মৌজা এস.ই.জেড. নির্মাণের জন্যে অধিকৃত হয়েছে, সেই মৌজা থেকেই লেবার সংগ্রহের জন্য দাবি উঠেছে। গড়ে উঠেছে লেবার ইউনিয়ন। সংগঠনে নাম লিখিয়ে তারা নিজেদের দাবি আদায়ের ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছে। লতিফ শেখ নৌকায় ফেরি করা ছেড়ে চলে এসেছে ফ্রি-ট্রেড জোনে দালালি করতে। বিনোদ বুঝিয়েছে, সেখানে কাজের অভাব নেই।

জমি অধিগ্রহণ ও সরকারি ক্ষতিপূরণ প্রসঙ্গ এই উপন্যাসে বিশেষ মাত্রা পেয়েছে। ‘হাইল্যাণ্ড’ কলোনি নির্মাণের জন্যে নেপালপুর মৌজার ৮০ একর জমি অধিগ্রহণ করেছে সরকার। ফলে এই অঞ্চলের জমিহারারা ক্ষতিপূরণের টাকা হাতে না পেয়ে জমি ছাড়তে চায় না। শিক্ষিত ছেলেরা সরকারি আধিকারিকদের কাছ থেকে চাকরির আশ্বাস পেতে চায়। যদিও বুড়ি খালিদা বিবির জমি হারানোর যন্ত্রণা সবকিছুকে ছাপিয়ে যায়,

‘ওই যে ছি পি টি-র মাঠ দেখতিছিস—ঐ কাদা ফেলা মাঠ হওয়ার আগে, ওই মাঠে আমাদের পনেরো বিঘে জমি ছ্যালো..বছর ফিরলে বিঘে ভুঁই আট দশ মণ ধান, খেয়ে মেখে ফুরোত নি—বেচে বাপের বাড়ি যেতুম! সেও তো তোরা নে-নিলি গাঙের মাটি ফেলাবি বলে। এখন ছেলেপুলে নে পেটের জ্বালায় জ্বালুন গুড়োই—কনটোলে পায়রার খাবার খাই। ছেলেরা আনলে তাদের বেটাপুতের মুখে দেয় কী আর আমাকে দেয় কী….’23

কিছুক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়েছে জমিহারারা। কৃষিলোন পেয়েছিল এমন কৃষকেরা যারা ঋণ শোধে ব্যর্থ হয়েছে, ব্যাঙ্ক তাদের ক্ষতিপূরণ আটকে দেবার আবেদন জানিয়েছে সরকারের কাছে। জমি যাদের থাকবে না, তাদের কৃষিলোন শোধ হবে কীভাবে—সরকারের নিয়ম-নীতি এক্ষেত্রে শিথিল না হলে বঞ্চিত হবে অনেকেই। স্থানীয় পঞ্চায়েতের ভূমিকা এক্ষেত্রে সদর্থক হওয়া জরুরি। তবে জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে পঞ্চায়েত সরকারের সিদ্ধান্তের পক্ষে। প্রধান, উপপ্রধানরা বাস্তুহারা হরিপদ, সৃষ্টিধরদের সান্ত্বনা দেয় রিলিফের খাদ্যশস্য, তেরপলিন জোগানোর।

     বাণিজ্যকেন্দ্র গড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ ফলতা সংলগ্ন কয়েকটি মৌজা। এখানকার বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষ হারাচ্ছে তাদের জীবিকার ক্ষেত্র, গ্রহণ করতে বাধ্য হচ্ছে অন্য জীবিকা। পরিবর্তনে স্রোতে গা ভাসাতে না পারলে হারিয়ে যেতে হয়—এই চিরসত্য বিশেষ মাত্রায় আভাসিত হয়েছে এই আখ্যানে। একটি অঞ্চলে দু-দুবার জমি অধিগ্রহণে সেখানকার মানুষজনের জীবন-জীবিকার সম্পর্ক কীভাবে বদলে যায়, তা লক্ষ করা গেল। হরিপদ’র ভাবনার সঙ্গে মিলেমিশে একাকার যায় সমস্ত বাস্তুহারাদের যন্ত্রণা—

‘কটা মানুষের পায়ের অবশ শব্দ। হরিপদর বুকের মধ্যে পিষে যায়। নিজেকেই শোনায়–, আর একটা কলোনি হল এই ত ! লোকে চেনাতে বোঝাতে বলবে—ওই-ই হাইল্যান্ড কলোনির….’24 

দেখা গেল উল্লিখিত উপন্যাসদুটিরই মৌল আবেদন শিল্পায়ন এবং জীবিকা সমস্যা কেন্দ্রিক। এ বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গ বিগত কয়েক দশক ধরে সাক্ষী থেকেছে শিল্পকেন্দ্রিক জমি অধিগ্রহণ ও তৎসম্পর্কিত পুনর্বাসন নিয়ে নানা জটিল সমস্যার। শিল্পায়নের জন্য উর্বর কৃষিজমি অধিগ্রহণ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট ভুক্তভোগী শ্রেণির প্রতিবাদের সম্মুখীন হয়েছে এবং সমালোচিত হয়েছে। এক্ষেত্রে সাম্প্রতিক অতীতের কৃষক অন্দোলন তার অন্যতম উদাহরণ হিসেবে গণ্য হতে পারে। সুতরাং প্রশ্ন দেখা দিতে পারে এই যে, বর্তমানের প্রেক্ষাপটে তাহলে কি শিল্পায়ন জরুরি নয়? যেকোনো সুশিক্ষিত সুনাগরিকই এর সদুত্তর জানেন। কারণ শিল্পায়ন ছাড়া দেশ ও দশের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। 

স্বভাবতই প্রশ্ন জাগতে পারে তাহলে শিল্পায়নের জন্য জমি অধিগ্রহণের প্রসঙ্গে এরূপ স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদের কারণ কী? প্রকৃতপক্ষে এর সদুত্তর লুকিয়ে আছে উপন্যাস দুটিতে। উভয় উপন্যাসে শিল্পায়নকেন্দ্রিক যে সমস্যা উদ্ভূত হয়েছে তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে যে মৌল বিষয়, সেটি হল জীবিকার পুনর্বাসন। কারণ অনেকক্ষেত্রেই আইনপ্রণেতা বা সরকারপক্ষ যে সত্যটা মানতে চান না তা হল,

“…ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন এক বস্তু নয়। যত টাকাই সরকার ক্ষতিপূরণ দেন না কেন সে টাকা বেশিরভাগ চাষীই ব্যাঙ্কে জমিয়ে বাড়াতে পারেন না বা তা দিয়ে জমি কিনতে পারেন না। হঠাৎ করে পাওয়া অনেকটা টাকা খুব কম সময়ের মধ্যে খরচ হয়ে যায়।”25 

‘পুনর্বাসন’ শুধুমাত্র বাসস্থানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়, জীবিকার পুনর্বাসনও বোঝায়। তবে কৃষিভিত্তিক সমাজব্যবস্থায় জীবন-জীবিকার পুনর্বাসন বেশ জটিল প্রক্রিয়া। ‘কৃষিভিত্তিক প্রাক-পুঁজিবাদী সমাজে জমির বিকল্প একমাত্র জমিই। জমি কৃষকের উৎপাদনের উপকরণই নয় শুধু, জমিই তার সামাজিক সম্পর্কের (social relation) ভিত্তি।’26 শিল্পায়নের কারণে যখনই জীবিকার পুনর্বাসনের প্রসঙ্গ এসেছে, তখনই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে জুটেছে তীব্র অবহেলা। এ প্রসঙ্গে বলে নেওয়া জরুরি, ঔপন্যাসিকদ্বয় শিল্পায়নের কুফল দেখাতেই গল্প ফেঁদেছেন – এমন সরলীকরণ করা বোধহয় উচিত হবে না। বরং সমাজতাত্ত্বিকের দৃষ্টি দিয়ে সমকালীন প্রেক্ষিতে শিল্পায়ন ও জীবিকার সংকট কীভাবে একীভূত হয়ে যায় – তার অনুপুঙ্খ ‘ডকুমেন্টরি’ উন্মুক্ত করেন আমাদের সামনে।  

  


সূত্রনির্দেশ


  1. মিশ্র, ভগীরথ (শারদীয় ১৪১২ ব.), আমি ও আমার সময়ের গল্পকার বন্ধুরা, কলকাতা, কোরক পত্রিকা (স. তাপস ভৌমিক), শারদীয় সংখ্যা, পৃ. ২১৫ ↩︎
  2. ঐ, পৃ. ২২২ ↩︎
  3. দাশ, চিত্তরঞ্জন (২০১০), পশ্চিমবঙ্গের ভূমিসংস্কার ও কৃষি-অর্থনীতি, কলকাতা, এম এল আর সি, পৃ. ১৪৯ ↩︎
  4. দ্র. সৈকত রক্ষিতের ‘প্লাসওয়ান’ শীর্ষক প্রবন্ধ, কোরক, প্রাক্‌-শারদ সংখ্যা, ১৪১৫। ↩︎
  5. রক্ষিত, সৈকত (১৪১৫ ব.), প্লাসওয়ান, কলকাতা, কোরক পত্রিকা (স. তাপস ভৌমিক), প্রাক্‌-শারদ সংখ্যা ১৪১৫, পৃ. ৯২ ↩︎
  6. তদেব। ↩︎
  7. রক্ষিত, সৈকত (১৯৮৪), আকরিক, কলকাতা, শিল্প সাহিত্য, পৃ. ১৬ ↩︎
  8. ঐ। পৃ. ২৬ ↩︎
  9. ঐ। পৃ. ৭৬ ↩︎
  10. তদেব। ↩︎
  11. তদেব। ↩︎
  12. ঐ। পৃ. ৯৪ ↩︎
  13. ঐ। পৃ. ২৫ ↩︎
  14. ঐ। পৃ. ৯৫ ↩︎
  15. ঐ। পৃ. ৪৫ ↩︎
  16. ঐ। পৃ. ৫৬ ↩︎
  17. মিশ্র, ভগীরথ (১৪১২ ব.), আমি ও আমার সময়ের গল্পকার বন্ধুরা, কলকাতা, কোরক পত্রিকা(স. তাপস ভৌমিক), শারদীয়া ১৪১২, পৃ.২২০-২১ ↩︎
  18. দাশ, চিত্তরঞ্জন (২০১০), পশ্চিমবঙ্গের ভূমিসংস্কার ও কৃষি-অর্থনীতি, কলকাতা, এম এল আর সি, পৃ. ১৫৭ ↩︎
  19. চট্টোপাধ্যায়, ঝড়েশ্বর (১৯৯২), বন্দর, কলকাতা, দে’জ পাবলিশিং, পৃ. ১৪ ↩︎
  20. ঐ, পৃ. ২৬ ↩︎
  21. ঐ, পৃ. ১২৯ ↩︎
  22. ঐ, পৃ. ৯৯ ↩︎
  23. ঐ, পৃ. ৬৭ ↩︎
  24. ঐ, পৃ. ১৬০ ↩︎
  25. গুহ, অভিজিৎ (২০১০), জমি অধিগ্রহণ ও উন্নয়ন, কলকাতা, নাগরিক মঞ্চ, পৃ. ৫৫ ↩︎
  26. দাশ, চিত্তরঞ্জন (২০১০), ঐ, পৃ. ১৬১ ↩︎

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *